মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটু হলেও যদি ইরানের বিক্ষোভকারী ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ভাবেন, তাহলে তাঁর উচিত হবে- তেহরানে হামলা না করা। হুমকি দেওয়াটাও বন্ধ করা উচিত। কারণ, হামলার পদক্ষেপ হবে বোকামি ও বিপজ্জনক। এতে ইরানের ‘দমনমূলক শাসকগোষ্ঠী’ আরও শক্তিশালী হতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও নাগরিকদের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে। […]

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটু হলেও যদি ইরানের বিক্ষোভকারী ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ভাবেন, তাহলে তাঁর উচিত হবে- তেহরানে হামলা না করা। হুমকি দেওয়াটাও বন্ধ করা উচিত।
কারণ, হামলার পদক্ষেপ হবে বোকামি ও বিপজ্জনক। এতে ইরানের ‘দমনমূলক শাসকগোষ্ঠী’ আরও শক্তিশালী হতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও নাগরিকদের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে। পরিস্থিতি সহজেই আরেকটি ব্যয়বহুল ও অজনপ্রিয় যুদ্ধে গড়াতে পারে।
ইরানে সম্প্রতি যে বিক্ষোভ হয়েছে সেটি এক কথায় নজিরবিহীন। এটি দমনে দেশটির শাসকরা শত শত, এমনকি সম্ভবত কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক দফায় ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সামরিক বাহিনী বিষয়টি দেখছে এবং আমরা খুব শক্ত বিকল্প নিয়ে ভাবছি।’ কিন্তু বাস্তবে যদি এর প্রয়োগ হয় তাহলে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
ইরানে হামলার হুমকি দেওয়া, কিংবা বাস্তবে হামলা চালানো হলে তা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নেতাদেরই সুবিধা দেবে। তারা বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলপন্থী এজেন্ট হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। তখন দমন, গ্রেপ্তার ও হত্যা করা আরও সহজ হবে।
সামরিক শক্তি ব্যবহার অনেক সময় আকর্ষণীয় মনে হয়। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন। তারা বলেছেন, হামলা চালালে দেশটির সামরিক বাহিনী, জনগণের বড় একটি অংশ এবং শাসকগোষ্ঠী সবাই বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে। গত বছরের জুনেও এমনটা দেখা গেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় অনেকে ইরানি জাতীয়তাবাদী চেতনায় একজোট হয়েছিলেন।
এবার হামলা হলে কী হতে পারে? উত্তর হলো- এতে অগণিত ইরানি প্রাণ হারাবেন। আহত কিংবা বাস্তুচ্যুত হবেন। অন্যদিকে মার্কিন সেনা ও নাগরিকদের, ইসরায়েলিদের (তেল আবিবের দখলে থাকা ফিলিস্তিনিদের) এবং পুরো অঞ্চলের মানুষের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এরই মধ্যে ইরানের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো হামলার জবাবে তারা পাল্টা আঘাত হানবে। অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও ইসরায়েলের ওপর আগাম হামলাও চালাতে পারে।
বর্তমানে তেহরানের শাসকদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে। তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ফলে তারা যদি পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাহলে তা গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের তুলনায় অনেক বেশি সহিংস হওয়ার আশঙ্কা আছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হতে পারে; যদি শাসকগোষ্ঠীর পতন বা আংশিক পতন হয়। মিত্রদের মাধ্যমে এ সংঘাত ছড়াতে পারে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের পর নিয়ন্ত্রণহীন যে সহিংসতা দেখা গিয়েছিল, সেটির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় কয়েক লাখ মানুষ পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। ইরানকে ঘিরে সংঘাত তৈরি হলেও তেমনটা দেখা যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে লিবিয়ার কথাও বলা যেতে পারে। শাসকবিরোধীদের সমর্থন দেওয়ার নামে সামরিক শক্তি ব্যবহার অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে। ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। এতে গাদ্দাফির পতন হলেও শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তাই ওই অভিযানকে জনগণের জন্য ‘অপরিমেয়’ ক্ষতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১০ লাখের বেশি। আজও লিবিয়া একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে স্ত্রীসহ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো নিজেকে আরও সাহসী মনে করছেন। কিন্তু অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এ ধরনের সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিরোধী। অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ জানে, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আর কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে হলে প্রেসিডেন্টের কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। ইতোমধ্যে কংগ্রেসের কিছু সদস্য বলেছেন, ইরানে হামলা চালাতে হলেও ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রচারের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন যুদ্ধবিরোধী। তিনি তখন বুঝতে পেরেছিলেন, যুদ্ধ শুরু করা বোকামি এবং রাজনৈতিকভাবেও ক্ষতিকর। ওই সময় তাঁর কথাবার্তায় আক্রমণাত্মকভাবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ঘোর বিরোধী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছিল। এমনকি প্রেসিডেন্টের অভিষেক ভাষণেও তিনি নতুন যুদ্ধ শুরুর বদলে ‘যুদ্ধ থামানোর’ অঙ্গীকার করেছিলেন।
এখন ট্রাম্প যদি ইরান যুদ্ধে জড়ান, তাহলে নিজ দেশে তাঁর সমর্থন আরও কমে যাবে। একই সঙ্গে এমন পদক্ষেপ ইরানের নেতাদের আরও শক্তিশালী করবে। তাই বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দেওয়া কিংবা কোনো অঞ্চল বা বিশ্বকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর সর্বোত্তম উপায় হতে পারে আলোচনা ও কূটনীতি। সামরিক শক্তি নয়।
(যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক সাময়িকী কাউন্টার পাঞ্চে লেখাটি প্রকাশ হয়েছে বৃহস্পতিবার। লেখক, রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানী। যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে তিনটি বই লিখেছেন। এর মধ্যে আছে- দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব ওয়ার: আ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব আমেরিকা’স এন্ডলেস কনফ্লিক্টস, ফ্রম কলম্বাস টু দ্য ইসলামিক স্টেট)











