শহীদ জিয়াউর রহমানের জীবন ছিল দায়িত্ব, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগে পরিপূর্ণ একজন সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়কে উত্তরণের বিরল উদাহরণ। বাংলার মাটি আর সবুজ প্রান্তরের বুক চিরে জন্ম নেওয়া এক রাখাল রাজা যিনি ইতিহাসে চিরস্বরণীয় হয়ে আছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নামে। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারী বগুড়ার এক সাধারন মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তার পিতার নাম ছিল মনসুর […]

শহীদ জিয়াউর রহমানের জীবন ছিল দায়িত্ব, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগে পরিপূর্ণ একজন সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়কে উত্তরণের বিরল উদাহরণ। বাংলার মাটি আর সবুজ প্রান্তরের বুক চিরে জন্ম নেওয়া এক রাখাল রাজা যিনি ইতিহাসে চিরস্বরণীয় হয়ে আছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নামে। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারী বগুড়ার এক সাধারন মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তার পিতার নাম ছিল মনসুর রহমান। মাতার নাম ছিল জাহানারা খাতুন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জিয়াউর ছিলেন তৃতীয়। তার বাবা কলকাতা শহরে এক সকারী দপ্তরে রষায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শৈশব ছিল অতি সাদামাটা, গ্রামের ধুলোমাখা পথে দৌড়ে বেড়ানো রাখালের বাঁশির সুরে বড় হয়ে ওঠা এক শিশুর জীবন। শৈশবের কিছুকাল গ্রামে এবং কিছুকাল শহরে অতিবাহিত হয়। ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার ফলে তার বাবা পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি শহরে বদলি হয়ে গেলে কলকাতার হেয়ার স্কুুল ত্যাগ করেন এবং করাচি একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু সময়ের অদৃশ্য হাত তাকে নিয়ে যাচ্ছিল এক অসাধারণ নিয়তির দিকে।
১৯৫২ সালে করাচি একাডেমি স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তারপর ১৯৫৩ সালে করাচিতে জিজে কলেজে বর্তি হন। এক বছরে তিনি কাকুন মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যারেট হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সালে সামরিক বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। করাচিতে দুই বছর চাকরি করার পর ১৯৫৭ সালে তিনি ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলী হয়ে পূর্ব পাকিস্তান আসেন। এছাড়াও তিনি ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। এই সময় ১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের দিন্জাপুরের বালিকা খালেদা খানম এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের কয়েক বছর পর ১৯৬৫ সালের পর খালেদা জিয়া করাচিতে স্বমীর কাছে চলে যান। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে পাঞ্জাবের ক্রিমক্রাম সেক্টরের একটি কোম্পানীর নেতৃত্ব দিয়ে সাহসীকতা ও পাকিস্তান প্রেমের পুরস্কার হিসেবে জিয়ার কোম্পানী সর্বাধিক বিরত্বের মেডেল পায়। নিজে হিলাল-ই-জুরাত খেতাব পান যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও উপাধি বীর উত্তম এর সমতুল্য। এরপর জিয়া ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানী মিলিটারি একাডেমিতে ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে যোগদান করেন। একি সালে কোয়েটার ঈড়সধহফ ধহফ ংঃধভভ পড়ষষধমব এ উচ্চতর কমিশন নেন। ১৯৬৯ সালে জার্মানিতে উচ্চতর গোয়েন্দ প্রশিক্ষণ এ ব্রিটিশ সেনাবাহীনিদের সাথে কাজ করেন। একিবছর পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় স্টাফ কলেজে কমানান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৭০ মেজর পদে পদন্নতি পেয়ে পূর্বপাকিস্তান জয়দেবপুর সেকেন্ড ইষ্টবেঙ্গলে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহন করেন।
জিয়াউর রহমান ছিলেন সাহস আর শৃঙ্খলা প্রতীক। পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে শিক্ষা গ্রহণ করে তিনি হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ ও দৃঢ়চেতা সেনা কর্মকর্তা। কিন্তু তার প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোতে। সেই উত্তাল সময়ে চট্টগ্রামের কালূরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার বজ্র কন্ঠে উচ্চারিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণা। সে ঘোষনা শুধু একটি বার্তা নয় তা ছিল বাঙ্গালীর বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় ভেঙ্গে দেওয়ার এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। একজন মেজর যিনি হয়ে উঠেছিলেন লাখো মুক্তিযোদ্ধার প্রেরণা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৭০ সালে তিনি চট্টগ্রাম সেনাবাহিনী ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সহ-অধিনায়ক হিসেবে সেখানে বদলি হন। আর ঐ রেজিমেন্টের সহকারী কর্নেল আলী আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন তখনই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা করেন। তিনি বলেন প্রায় সময় দেখতাম তিনি দেশের ব্যাপারে খুব চিন্তিত থাকতেন। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের রাত্রে নিরস্ত্র মানুষের উপর পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমন এর পর অষ্টম ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা বিদ্রোহো করেন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ রাতে যখন আমরা শুনলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম ও বর্বর নৃশংস হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সমগ্র ঢাকাকে তাদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম থেকে একমাত্র তখন আমরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করি। ২৫ শে মার্চের শেষ প্রহরে অথবা ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন যা ট্রান্সমিটার এর মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পাড়ে। মেজর জিয়া ও তার বাহিনী সামনের সারি থেকে মুক্তিযুদ্ধে পরিচালিত করেন এবং বেশ কয়েক দিন চট্রগ্রাম এবং নোয়াখালী অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মুখে কৌশলগতভাবে সীমানা অতিক্রম করেন। ১০ এপ্রিল মুজিব নগর সরকার গঠন ১৭ এপ্রির মুজিব নগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর তিনি এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন। চট্্রগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ,রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগঞ্জ, ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন।
তিনি ফেনী ছাত্র-যুবকদেরকে সংগঠিত করে প্রথম প্রথম তারা ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিনটি সমন্বয়ে মুক্তি বাহিনীর প্রথম খন্ড বিগ্রেড জেড ফোর্স এর অধীনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল হতে জুন পর্যন্ত এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার এবং তারপর জুন হতে অক্টেবর পর্যন্ত যুগপত ১১ নম্বর সেক্টরের ও জেড ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশ গ্রমন করেন। দীর্ঘ্য নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্ত হলে লাল সবুজের পতাকায় স্বাধীন দেশে পুনরায় সেনাবাহিনীতে ফিরে যান এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিপ অব মেজিস্ট্রেট স্টাফ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি তিনি বিগ্রেডিয়ার পদে এবং বছরের শেষে মেজর জেনারের পদে পদন্নতি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধে বিরত্বের জন্য বাংলাদেশ তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভুষিত করেন।
শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর খন্দকার মোস্তাক রাষ্ট্রপতি হলেও সবকিছুর কলকাঠি হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সেনাকর্তারা। তখন সেনাবাহিনীর চিপ অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছিল। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আসে ৩ নভেম্বর অভ্যুথান। এই অভ্যুথানের মাধ্যমে খন্দকার মোসতাক আহমেদকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং বন্ধি করা হয় সেনা প্রধান জিয়াউর রহমানকে। খালেদ মোশারফের এই অভ্যুথান স্থায়ী হয়েছিল মাত্র চারদিন। ১০ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে পাল্টা আরেকটি অভ্যুথানে নিহত হয় খালেদ মোশরফ সহ আরো কয়েকজন উদ্ধর্তন সেনা কর্মকর্তারা। সেই অভ্যুথানের মাধ্যমে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন সেনাবাহিনীরা। এরপর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন মেজর জিয়াউর রহমান।
জিয়ার ক্ষমতা গ্রহন ১৩ নভেম্বর ১৯৭৫। অভ্যুথানের মাধ্যমে খন্দকার মোস্তাককে ক্ষতাচ্যুত করা খালেদ মোশারফ এর নেতৃত্বে অফিসাররা ৫ই নভেম্বর ক্ষমাতাচ্যুত হন। ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন আবু সাদাত মুহম্মদ সায়েম। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে পাল্টা অভ্যুথানের পর বন্ধিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষমতায় চলে আসে মেজর জিয়াউর রহমান। আবু সাদাত মুহম্মদ সায়েম একাধারে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। কিন্তু ১ বছর পরে ১৯ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি সায়েমকে সরিয়ে জিয়াউর রহমান নিজেকে রাষ্ট্রপতি অধিষ্টিত করেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার ১ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী দল বিএনপি গঠন করেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের জন্য আশির্বাদ হয়ে আসে। এই অভ্যুথান বাংলাদেশের রাজনিতীর খোলস বদলে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ যখন ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে তখন জিয়াউর রহমান নিজেকে শুধুই একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বুঝেছিলেন স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা নয়, স্বাধীনতা মানে মানুুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনা। রাজনীতিতে প্রবেশ করে তিনি দায়িত্ব নেন এক বিপর্যস্ত রাষ্ট্র গঠনের। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার কন্ঠে উচ্চারিত “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” ছিল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার এক নতুন দর্শন।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দল নতুন এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার দল আওয়ামীলিগের প্রতি। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মধ্যে ডানপন্থি রাজনিতীর উদ্ভব হয়। ক্ষমতায় থাকাকালীন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশের জাতীয়তাদল বা বিএনপি অন্যতম বড় রাজনৈতিক দলে পরিনত হয়। জিয়াউর রহমানের শাষনকালে রাজনীতি, কুটনীতিতে বড় পালা বদল ঘটে।
এই সব ঘটনা অনেকের দৃষ্টিতে ইতিবাচক আবার অনেকের দৃষ্টিতে নিতীবাচক। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় শাসন ব্যবস্থায় রাজনীতিতে ফেরে। পুনপ্রাবর্তনের ফলে তৎকালীন বাংলাদেশে একাটি মোলিক পরিবর্তন আসে। এর ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দলভুক্ত হয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল।
কিন্তু জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনীতে ফিরে আাসর ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালুর সুযোগ হয়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরে জাতীয়বাদ ধারা চালু করে এবং সংবিধানে সেটা অন্তর্ভুক্ত করেন। জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন বাংলাদেমে অনেক ধর্ম, বর্ণ, গোষিঠর লোক বাস করেন তাদের সংগ্রাম এবং জীবন যাত্রার মান আলাদা ও ভিন্ন । জিয়াউর রহমান মনে করেন শুধুমাত্র ভাষা ও সাংস্কৃতির ভিত্তিতে নয় বরং ভুখন্ডের ভিত্তিতেই জাতীয়তাবাদকে গ্রহন করা উচিৎ।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি পর্যবেক্ষণ করে অনেকে মনে করেন জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারত থেকে বেরিয়ে চীন, আমেরিকা, সৌদি আরব এর সাথে সুসম্পর্ক তৈরী হয়। জিয়াউর রহমান ভারত বিরোধী ভুমিকায় যাননি। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। মুসলিম দেশগুলোর ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে একটি অনুচ্ছেদ যোগ করেন। জিয়উর রহমানের শাসনামলে দক্ষিণ এশিয়ার জোট এক করার জন্য তিনি সংগ্রামী ভুমিকা পালন করেন। এছাড়া জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা সংসদ পরিষদে অস্থায়ী সরকার হিসেবে নির্বাচিত হয়। পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করে জিয়াউর রহমান সবাইবে অর্ন্তভুক্ত করে রাজনিতী ও সরকার পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন।
গ্রাম বাংলার মানুষের প্রতি ছিল তার গভীর মমতা। কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর সবাইকে তিনি ভাবতেন একটি শক্তিশালী বাংলাদেশের কথা। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করে তিনি রাজনীতিতে ভিন্নমতের স্বীকৃতি দেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন সবখানেই ছিল তার সক্রীয় ছাপ।
১৯ দফা কর্মসূচি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে একটি গুরুত্বপুর্ণ কর্মসূচি ছিল। এই কর্মসূচির মধ্যে ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিক অন্তরভুক্ত ছিলো। কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন, খাদ্য সয়ংসম্পুর্নতা অর্জন, প্রশাসন বিকেন্দ্রিকরণ, ব্যক্তিখাতে শিল্প কারখানার বিকাশ। এই কর্মসূচির একটি উল্লোখযোগ্য বিষয় ছিল খাল খনন কর্মসুচি এবং গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু করা। তিনি পুলিশ বাহিনী শক্তিশালী করেন। পুলিশের সংখ্যা দিগুন বৃদ্ধি করেন। তিনি তাদের যথযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে ৮মার্চ মহিলা পুলিশ গঠন করেন। তিনি ১৯৭৬ সালে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন।
জিয়াউর রহমান অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীন সেনা ও বিমান বাহিনীতে দফায় দফায় অভ্যুথারন হয়। প্রতিটি অভ্যুথান কঠোর হস্তে দমন করেন জিয়াউর রহমান। অনেক উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। বিপদের সমুহ সম্ভাবনা জেনেও চট্রগ্রামের স্থানীয় কর্মকর্তরদের মধ্যে গিবত-কলহ থামানোর জন্য ১৯৮১ সালে ২৯ মে চট্টগ্রাম এ আসেন এবং সেখানে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে থাকেন। তারপর ৩০ মে গভীর রাতে এক ব্যর্থ সামকির অভযানে নিহত হন। জিয়াউর রহমানকে ঢাকার শেরেবাংলায় সমাহিত করা হয়। প্রেসিডেন্ড এর জানাযায় বাংলাদেশের অধিকমাত্রায় জনগন শরিক হয়। সেখানে প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ জানাযায় শরিক হন। তাকে চন্দ্রিমা উদ্যানে দাফন করা হয়।
বন্দুকের গুলিতে থেমে যায় এক সংগ্রমী হৃদয়ের স্পন্দন, কিন্তু থেমে যায় না তার আদর্শ। রক্তে রঞ্জিত সেই ভোর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বয়ে আনে এক গভীর শোক আর শূন্যতা। শহীদ জিয়া আজো বেঁচে আছেন মানুষের স্মৃতিতে, সংগ্রামে, সাহসে। তিনি ছিলেন রাখাল রাজা যিনি সাধারণ মানুষের মাঝ থেকে উঠে এসে একটি জাতিকে পথ দেখিয়েছেন। ইতিহাসের পাতায় তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রপতি নন, তিনি এক অনন্ত প্রেরণার নাম।
এক নজরে শহীদ জিয়া
১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ : বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীগ্রামে জন্মগ্রহণ।
১৯৪০,১৯৫০ : শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা কলকাতা ও বগুড়া অঞ্চলে।
১৯৫৩ : পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি, কাকুলে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান।
১৯৫৫ : কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান (২হফ লেফটেন্যান্ট)।
সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন (পাকিস্তান আমল)
১৯৫৫,১৯৭০ : বিভিন্ন সামরিক ইউনিটে দায়িত্ব পালন।
১৯৬৫ : ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ।
১৯৬৬,১৯৬৯ : স্টাফ কলেজসহ বিভিন্ন সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন।
১৯৭০ : মেজর পদে উন্নীত।
মহান মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১)
২৫ মার্চ ১৯৭১ : পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু।
২৬২৭ মার্চ ১৯৭১ : চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ।
এপ্রিল ১৯৭১ : ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।
জুন ১৯৭১ : জেড ফোর্স (ত ঋড়ৎপব) গঠন ও কমান্ডার নিযুক্ত।
ডিসেম্বর ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন; বাংলাদেশ স্বাধীন।
স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
১৯৭২ : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্রিগ্রেডিয়ার হিসেবে যোগদান।
১৯৭৩ : ডেপুটি চিফ অব স্টাফ।
২৫ আগস্ট ১৯৭৫ : সেনাবাহিনীর প্রধান (ঈযরবভ ড়ভ অৎসু ঝঃধভভ) নিযুক্ত।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ : সিপাহীজনতার অভ্যুত্থানের পর জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন
১৯ এপ্রিল ১৯৭৭ : গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।
১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা।
১৯৭৮ : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী।
১৯৭৭,১৯৮১ : বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্প্রসারণ
গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদনে জোর
“বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” দর্শনের প্রবর্তন
ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে কুটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার
স্বনির্ভর অর্থনীতি ও শ্রমভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন প্রণয়ন
শাহাদাত
৩০ মে ১৯৮১ : চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ভোররাতে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে শহীদ হন।
৩১ মে ১৯৮১ : ঢাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন (শেরেবাংলা নগর)।











