অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩৪৬টি। এর আগেও অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা নগণ্য। এসব অস্ত্র কেন উদ্ধার হচ্ছে না– সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ জন্য সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ […]

অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩৪৬টি। এর আগেও অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা নগণ্য। এসব অস্ত্র কেন উদ্ধার হচ্ছে না– সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ জন্য সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি।
সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ২০তম সভা গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত বছর ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় লুণ্ঠিত বিপুল অস্ত্র কেন উদ্ধার করা যাচ্ছে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। একাধিক বাহিনীর প্রতিনিধি বৈঠকে জানিয়েছেন, ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এ লুট ও অবৈধ কয়েকটি অস্ত্র এবার পুকুরে পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছেও লুট হওয়া অস্ত্র আছে। এ জন্য তারা অস্ত্রগুলো ভয়ে পুকুরে ফেলেছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা খুবই কম। নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হারানো অস্ত্রসহ যে কোনো অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এক হাজার ৩১০টি এখনও উদ্ধার হয়নি। থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করার পরও তা উদ্ধার হয়নি। অবৈধ অস্ত্রও নির্বাচনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
হামলা, সংঘাত ও সহিংসতা ছাড়াও আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ কী ধরনের তৎপরতা চালাতে পারে, সেটা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ইতোমধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিগগির অনলাইনে সংবাদ সম্মেলন করে কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শঙ্কা, নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে ভোটের আগে আক্রমণ হতে পারে। এ জন্য এখানে বাড়তি নিরাপত্তা দিতে হবে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তবে এর মোট সংখ্যা এই মুহূর্তে জানা নেই। পরে এ বিষয়ে জানানো হবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও গত তিনটি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিশনের সদস্য, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, এর আগে সব নির্বাচনে আগে দেখেছি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও বৈধ অস্ত্র থানায় জমা নেওয়া হতো। একই সঙ্গে ভোটের আগে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু এবার সেটা দেখা যাচ্ছে না। বরং সরকার ভিন্ন দিকে যাচ্ছে। ফলে সুষ্ঠু ভোট হবে কিনা সেটা নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। তবে সবকিছুর জন্য সরকারকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ভোটের আগে পরিস্থিতি খারাপ হলে কেন্দ্রে ভোটার নেওয়া কঠিন হতে পারে।
আবদুল আলীম আরও বলেন, রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংসদ সদস্য প্রার্থীর অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা জারি করায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে সবচেয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির ওপর গুলির ঘটনা ঘিরে। গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছু পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ওসমান হাদির মাথায় গুলি করা হয়। পরে তিনি মারা যান। এ ঘটনার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলি করে হত্যার অন্তত ১০টি ঘটনা ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিতে অস্ত্রধারী গানম্যান দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমকে অস্ত্রধারী দেহরক্ষী দেওয়া হয়েছে। দেহরক্ষী পেয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও মেহেরপুর-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী মাসুদ অরুণও।
প্রচারণা শুরু হলে আরও বাড়বে অবৈধ অস্ত্রের ভয়
ওসমান হাদির ঘটনার পর সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অস্ত্রের লাইসেন্স এবং অস্ত্রধারী দেহরক্ষী চেয়ে আবেদন করেছিলেন ২০ জনের মতো রাজনীতিবিদ। আগামী বৃহস্পতিবার প্রতীক পেয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে অবৈধ অস্ত্রের ভয় আরও বাড়বে। নিরাপত্তা চাওয়া প্রার্থীর সংখ্যাও বাড়বে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কারণ, সংঘাতের ঘটনা বাড়লে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে। এদিকে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাউকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না। দেশে দ্রুত যৌথ অভিযান শুরু হবে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অত্যন্ত জরুরি।
মাঠে থাকবে ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। নির্বাচনে সারাদেশে ৯টি বাহিনীর মোট আট লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ সদস্য মোতায়েন করা হবে।
এর মধ্যে সেনাবাহিনীর এক লাখ, নৌ-বাহিনীর পাঁচ হাজার, বিমান বাহিনীর তিন হাজার ৭৩০ (স্থলভাগে এক হাজার ২৫০), পুলিশের এক লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্টগার্ডের তিন হাজার ৫৮৫, র্যাবের সাত হাজার ৭০০ এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০ সদস্য মাঠে থাকবেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন তদারকিতে বিভিন্ন বাহিনীর ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ২০০টি, বিজিবি ১০০টি, পুলিশ ৫০টি এবং অন্য বাহিনী বাকি ড্রোনগুলো পরিচালনা করবে।
এ ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের পোশাকে থাকবে ২৫ হাজার ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’। এ ছাড়া, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) প্রস্তুত করা ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ-২০২৬’ এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।











