জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। তাঁর শাসন আমলে দেশের অর্থনীতিতে উন্নতি, শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়ানোয় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে তাঁর দিকনির্দেশনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি শুধু জাতীয়তাবাদী দলের নেতা ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই মানুষের এবং দেশের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। গতকাল শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ […]

জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। তাঁর শাসন আমলে দেশের অর্থনীতিতে উন্নতি, শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়ানোয় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে তাঁর দিকনির্দেশনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি শুধু জাতীয়তাবাদী দলের নেতা ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই মানুষের এবং দেশের নেতা হয়ে উঠেছিলেন।
গতকাল শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উন্মুক্ত স্থানে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সভা শুরু হয়। পরে শোকগাথা পাঠ করা হয়।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে খালেদা জিয়াকে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। শেষে খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান সিঁথি এবং জোবাইদা রহমানের বড় বোন শাহীনা জামান বিন্দু।
সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, খালেদা জিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধিকবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং গণতান্ত্রিক সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়চেতা। রাজনীতি, সংগ্রাম ও কঠিন সময়ের মধ্যেও তিনি ধৈর্য ও আত্মমর্যাদার পরিচয় দিয়েছেন।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া প্রতিহিংসার মামলায় দীর্ঘদিন কারাবাস করেছেন। এটি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। সরকারকে অনুরোধ করব, খালেদা জিয়াকে যেন সর্বোচ্চ সম্মানসূচক রাষ্ট্রীয় উপাধি দেওয়া হয়।
অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, খালেদা জিয়া দেশকে ও এই জনপদকে ভালোবাসতেন। ভারত সরকার যখন টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল, তখন তিনি আমাদের বলেছিলেন, একটা বড় আকারের সেমিনারের আয়োজন করতে; যাতে আমরা দাবি জানাতে পারি। আজকে এখানে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর তিনটি উক্তির কথা স্মরণ করতে চাই, এক. দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই, দুই. আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা, ওদের হাতে বন্দির শৃঙ্খল এবং তিন. দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, দেশই আমার শেষ ঠিকানা। এই মন্ত্রগুলো ধারণ করলে তাঁর দল ও এই দেশ রক্ষা পাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, খালেদা জিয়ার অদ্ভুত একটা বিচার হয়েছিল। তিনি আইনজীবীর কথা শুনে বিস্ময়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘কি আমি এতিমের টাকা মেরে খেয়েছি!’ এই বাক্যটাকে বিচারক লিখেছিলেন, বেগম জিয়া নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি কাজটা করেছেন। এত জঘন্য বিচার হয়েছে। এটার বিরুদ্ধে বিবৃতির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি।
মানে ফোন করেছি। চারজনের বেশি রাজি হন নাই।’
খালেদা জিয়ার চিকিৎসাজনিত অবহেলার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তাঁর চিকিৎসায় গঠিত চিকিৎসক দলের সদস্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ইচ্ছাকৃত অবহেলা ছিল। এটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং এটি তাঁকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
খালেদা জিয়ার কারাজীবনের চিকিৎসায় বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরে এ চিকিৎসক বলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিএমইউর সব ডকুমেন্ট আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করেন তিনি।
সভায় ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, আমার সৌভাগ্য যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। একজন স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে আমার মন জয় করে নিয়েছিলেন তিনি।
মাহফুজ আনাম বলেন, জেল, গৃহবন্দি এত কিছুর পরও খালেদা জিয়া যখন মুক্ত হয়ে ভাষণ দিলেন, সেখানেও তিনি প্রতিশোধের কথা বলেননি। খালেদা জিয়ার যে শেষ বাণী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান, আমরা যেন সবাই এটাকে ধারণ করি।
নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তিনি শুধু জাতীয়তাবাদী দলের নেতা ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই মানুষের এবং দেশের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। দলমত নির্বিশেষে জানাজায় লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে।
আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও সংগ্রামের পতাকা আজ তারেক রহমানের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। এটি যেমন গর্বের, তেমনি এক গভীর দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জেরও বিষয়। দেশের মানুষ সবসময় তারেক রহমানকে তাঁর পিতা ও মাতার সঙ্গে তুলনা করবে। এই তুলনা অত্যন্ত কঠিন– যে কোনো মানুষের জন্যই।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, খালেদা জিয়ার প্রধানতম তিনটি বড় গুণ ছিল। তিনি শুনতেন, তিনি প্রশ্ন করতে জানতেন এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন দেশের স্বার্থ ও বৈশ্বিক গুরুত্ব বিবেচনায়। আমি বিশ্বাস করি, তাঁকে জাতি মনে রাখবে। জাতির এই সন্ধিক্ষণে তাঁর উপস্থিতি, পরামর্শ, দিকনির্দেশনা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।
আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়ার সরকারের সময় অবকাঠামো উন্নয়ন, আইনের শাসন, বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার নীতি দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সাহায্য করেছে। একই সময়ে সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তাঁর কিছু উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আইসিসিবির নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বলেন, নব্বইয়ের দশকে খালেদা জিয়ার বাজারমুখী নীতির বেসরকারি খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি আসে। তাঁর সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়েছে।
শোকসভা ঘিরে নিরাপত্তায় ছিলেন সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অনুষ্ঠানের শৃঙ্খলার দায়িত্বে ছিলেন বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
আশরাফ কায়সার ও কাজী জেসিনের সঞ্চালনায় সভায় গবেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম ফায়েজ, কূটনীতিক আনোয়ার হাশিম, ডিপিআইর প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার দুলাল, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ, যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক বিশেষ সহকারী রাজা দেবাশীষ রায়, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আব্দুস সালাম, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বক্তব্য রাখেন। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা মঞ্চে বক্তব্য দেননি।
সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ড. আব্দুল মঈন খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় দেশের শীর্ষ রাজনীতিক, বিদেশি কূটনীতিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন।











