সম্পূর্ণ নিউজ Banglardarpan24.com

মতামত
১১:৫২ অপরাহ্ণ, ৭ জানুয়ারি ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রতিরোধ চাই

ভেনেজুয়েলা যখন থেকে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বাইরে গিয়ে নিজেদের সম্পদ ও ব্যবস্থা মুক্ত করার চেষ্টা শুরু করেছে, তখন থেকেই মার্কিন আগ্রাসী তৎপরতা শুরু হয়েছে। নানা চক্রান্ত ব্যর্থ হবার পর গত কিছুদিন ট্রাম্প প্রশাসন কলম্বিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিসহ সাগরে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি করে। এর বাইরে ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। তারপর গত ৩ […]

Venezuela
মতামত ডেস্ক
৫ মিনিটে পড়ুন |

ভেনেজুয়েলা যখন থেকে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বাইরে গিয়ে নিজেদের সম্পদ ও ব্যবস্থা মুক্ত করার চেষ্টা শুরু করেছে, তখন থেকেই মার্কিন আগ্রাসী তৎপরতা শুরু হয়েছে। নানা চক্রান্ত ব্যর্থ হবার পর গত কিছুদিন ট্রাম্প প্রশাসন কলম্বিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিসহ সাগরে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি করে। এর বাইরে ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। তারপর গত ৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক নিয়ম, আইন, শিষ্টাচার পুরোপুরি লঙ্ঘন করে বিশ্বসন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ ট্রাম্প বাহিনী দেশটিতে হামলা চালায় এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে যায়। তাদের আক্রমণে নিহত হন ৪০ জনের বেশি ভেনেজুয়েলার নাগরিক। সরাসরি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপের এমন ঘটনা সবাইকে স্তম্ভিত করেছে। জাতিসংঘ নামে যে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা এখন পুরোপুরি অকার্যকর, তা আমরা ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও দেখেছি এবং এই ঘটনা একই বাস্তবতা তুলে ধরেছে। জাতিসংঘ এখনও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা বা উদ্যোগ নেয়নি।

বর্তমান বিশ্ব-(অ)ব্যবস্থার একটি চেহারা আমরা এর মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। পুরোপুরি মাস্তান-দখলদারের মতো কথা বলছেন ট্রাম্প– যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে মাদুরোর বিচার করা হবে; তেল কোম্পানি তেলসম্পদের দখল নেবে; ভেনেজুয়েলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি অবিশ্বাস্য ও অবাস্তব ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। তবে অন্য দেশ দখল, খুন, গণহত্যা ইত্যাদি বিবেচনা করলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি নতুন ঘটনা নয়। ১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন পারমাণবিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিবলে পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয় তখন থেকে মার্কিন গবেষক উইলিয়াম ব্লুমের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে এ ধরনের শতাধিক ঘটনা ঘটিয়েছে।

এসব আগ্রাসন সব সময় প্রত্যক্ষভাবে হয় না। যেমন ১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে শুধু ক্ষমতাচ্যুতই করা হয়নি, বরং হত্যাকাণ্ডও চালানো হয়েছে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে যুদ্ধ করতে করতে নিহত হন। সেই আগ্রাসনের নেপথ্যে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল। তবে ঘটনাটি ঘটিয়েছিল চিলির সামরিক বাহিনী। বিভিন্ন দেশে সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোতে সিআইএর ভূমিকা নতুন কিছু নয়। যখনই কোনো দেশের সরকার জনস্বার্থে তাদের কর্তৃত্ব থেকে বের হতে চেষ্টা করে, তখন তার বিরুদ্ধে প্রথমে অপপ্রচার ও পরে নিষেধাজ্ঞা, সব শেষে সামরিক অভিযান চালানো হয়। যেহেতু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে, সুতরাং অব্যাহত প্রচারণা চালানোর মধ্য দিয়ে একটি বিশ্বজনীন জনমত তৈরি করা হয়। এটিও তাদের কৌশলের অংশ।

আমরা খেয়াল করলে দেখব, মাদুরোকে বলা হচ্ছে স্বৈরশাসক কিংবা তাঁর নির্বাচন যথাযথ হয়নি; তিনি অত্যাচারী, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। বেশ কয়েক বছর ধরে সংবাদমাধ্যমে এসব প্রচার চালানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ যারা– যেমন মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক সরকার কিংবা পৃথিবীর কয়েক দশকের ইতিহাসে যত নৃশংস স্বৈরশাসক ছিল এবং জোরজবরদস্তি করে শাসন কায়েম রেখেছিল, তাদের ব্যাপারে কখনও এসব শব্দ ব্যবহার করা হয় না। কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থারই অংশীদার ছিল। তার মানে, একনায়ক, স্বৈরশাসক, গণতন্ত্র, মানবাধিকার– এসব শব্দ যুক্তরাষ্ট্র তাদের সুবিধামতো ব্যবহার করে। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের পক্ষে যারা অবস্থান নেয়, তারাই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে। এর বিপরীত হলেই তারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিরোধী।

এক সময় মনরো ডকট্রিন অনুযায়ী বলা হয়েছিল, লাতিন আমেরিকা অবধারিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে থাকবে। বিভিন্ন সময় লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এই নিয়ন্ত্রণ-বলয় থেকে বেরোনোর চেষ্টা করে। একুশ শতকের প্রথম দশকে ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া ও কিউবা– এই তিন দেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সহযোগিতার দৃঢ় বন্ধন তৈরি হয়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের বাইরে বৈশ্বিকভাবে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তিনি দেশটিতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বাংলাদেশের মতো সেখানেও দুই দল পালাক্রমে সাম্রাজ্যবাদী ধনিক শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে ভেনেজুয়েলার জনগণের জীবন একেবারে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে হুগো শাভেজ একটি বলিভারিয়ান বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সে উদ্যোগে কাছে পেয়েছিলেন বলিভিয়া ও কিউবাকে।

যেহেতু শাভেজ তেলসম্পদের ওপর ভেনেজুয়েলার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন এবং জনগণের মৌলিক পরিবর্তন তথা সংস্কারে হাত দিচ্ছিলেন, সেহেতু তা দেশটির ধনিক শ্রেণির প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। এক পর্যায়ে হুগো শাভেজকে উচ্ছেদের জন্য ২০০২ সালে সামরিক বাহিনীর একাংশ দিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। এখানেও নেপথ্যে ছিল মার্কিন মদদ। হুগো শাভেজকে আটকের পরে সেখানে মার্কিন দালালদের সরকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। খুবই হাস্যকর হলেও হোয়াইট হাউস সঙ্গে সঙ্গে তার স্বীকৃতি দিয়েছিল। তারা ধরে নিয়েছিল– দালাল সরকার টিকবে। তা টেকেনি এবং অন্য অনেক দেশের মতো তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ হুগো শাভেজকে গ্রেপ্তারের পরপরই ব্যাপক জনপ্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল। কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও উপশহরে তা ছড়িয়ে পড়ে। এতে মার্কিন দালালরা পালায় এবং তাদের পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে যায়। তারপর হুগো শাভেজ আরও শক্তিশালীভাবে দেশের অর্থনীতি রাহুমুক্ত করতে অগ্রসর হন। কিন্তু হুগো শাভেজের ক্যান্সারে অকালমৃত্যু হয়। তারপর মাদুরো ক্ষমতায় আসেন এবং সেই ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেন। এখানেই মাদুরোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বাধে। গত কয়েক দিনে আমরা যা দেখছি, তা যুক্তরাষ্ট্রের সেই দীর্ঘদিনের বিরোধিতার ধারাবাহিকতা।

এই সময়ের মধ্যে মার্কিন মদদে ভেনেজুয়েলায় কয়েকটি পুতুল তৈরি করা হয়েছিল। কোনো পুতুলই কাজ করেনি। শেষ পুতুল মারিয়া কোরিনা মাচাদো, যাঁকে ‘শান্তি পুরস্কার’ দিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থিত করা হয়েছে, তিনি ভেনেজুয়েলার সব সম্পদ মার্কিন কোম্পানিকে দিতে চান এবং মাদুরোকে হটানোর জন্য মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের আহ্বান জানিয়েছেন। সর্বশেষ এ ঘটনা ঘটাল।

মাদকদ্রব্যের ব্যাপারটি পুরোটাই গল্প। আসল কথাটি ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের কর্তৃত্ব নেবে মার্কিন কোম্পানি। সেই তেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য কোম্পানি কাজ করবে, আর ভেনেজুয়েলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের পুরো ভূমিকা এবং কথাবার্তার মধ্যে আমরা পাড়ার সন্ত্রাসী বা ডাকাতের আচরণ দেখতে পাই। মূলত দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংকটের কারণে এখন তিনি নিজেই বেপরোয়া। ট্রাম্পের দুই হাতের একটি সামরিক শক্তি, অন্যটি তেল কোম্পানি।

তার মানে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং দেশটির ধনিক শ্রেণির স্বার্থ ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা কায়েম করাই হলো ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য। সেই সঙ্গে অন্যদের হুমকি দেওয়া। সেই লক্ষ্যে তিনি যেভাবে অগ্রসর হচ্ছেন, তা সারাবিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। সব ধরনের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তিনি এ তৎপরতা চালিয়েছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের মানুষের এগিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, গণতন্ত্র কিংবা মানবাধিকার প্রশ্নে জনগণকে সংগঠিত করা দরকার। ভেনেজুয়েলায় যা চলছে, তার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্যও খুবই প্রাসঙ্গিক। কারণ এখানেও বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী নীলনকশা আছে। এ জন্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বৈশ্বিক আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষেরও যুক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক; ‘হুগো শ্যাভেজের সাথে: ভেনেজুয়েলার গল্প’ গ্রন্থের লেখক

Facebook Comments Box
এ বিভাগের আরও খবর


Advertise with us
আর্কাইভ ক্যালেন্ডার
রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১
Advertise with us
আরও Banglardarpan24.com সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com